ইরানে যুদ্ধ BRICS ঐক্য ও ভারতের “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট” কৌশলকে পরীক্ষায় ফেলছে
ইসরায়েল-আমেরিকার সমর্থিত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ BRICS জোটের রাজনৈতিক ঐক্যকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে এবং ভারতের “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট” (বহুমুখী সম্পর্ক) কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
BRICS ঐক্য ও ভারতের অবস্থান
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ BRICS-এর জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল মুহূর্তগুলোর একটি তৈরি করেছে।
এই জোটটি (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) মূলত গ্লোবাল সাউথের বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে।
কিন্তু এখন বড় একটি দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে—
- ইরান এখন BRICS-এর সদস্য
- আর ভারত একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করছে
ফলে জোটের ভেতরে রাজনৈতিক অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ভারত নিজেকে গ্লোবাল সাউথের নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চায়, কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ভারতের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন নয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে এই সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছে।
ইসরায়েল ভারতের জন্য সরবরাহ করেছে—
- উন্নত অস্ত্র
- বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি
- ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা
- গোয়েন্দা সহযোগিতা
বর্তমানে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে, যেমন:
- সাইবার সিকিউরিটি
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
- সামরিক প্রযুক্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত তার বৈদেশিক নীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিজের ক্ষমতা বাড়াতে চায়—এটাই “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট”।
ইরান ইস্যুতে ভারতের নীরবতা
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো—
ভারত ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-আমেরিকার হামলার সরাসরি নিন্দা করেনি।
ভারতের কৌশল হলো “calculated ambiguity” (পরিকল্পিত অস্পষ্টতা)।
অর্থাৎ, সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে—
- শান্তি
- স্থিতিশীলতা
- কূটনৈতিক সমাধান
এই ধরনের সাধারণ কথা বলা।
এর ফলে ভারত একই সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে—
- ইসরায়েল
- ইরান
- উপসাগরীয় দেশগুলো
কিন্তু অন্য BRICS দেশগুলো—
চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা—
ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে।
এখানেই BRICS-এর ভেতরে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
“মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট”-এর সীমাবদ্ধতা
ভারতের নীতি হলো—
একটি ব্লকের সঙ্গে না থেকে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা।
এতে সুবিধা:
- বিভিন্ন দিক থেকে লাভ নেওয়া যায়
- কূটনৈতিক স্বাধীনতা থাকে
কিন্তু সমস্যা হলো—
একই জোটের একটি দেশ আক্রমণের শিকার হলে
আরেকটি দেশ যদি নীরব থাকে, তাহলে উত্তেজনা তৈরি হয়।
প্রশ্ন উঠে—
এই নীতি কি সত্যিকারের নিরপেক্ষতা,
নাকি গোপনে একপক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়া?
জ্বালানি ও কৌশলগত ঝুঁকি
এই পরিস্থিতি ভারতের অর্থনীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প:
ইরানের চাবাহার বন্দর
👉 যা ব্যবহার করে ভারত
- পাকিস্তান এড়িয়ে
- মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য করে
যদি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়,
তাহলে এই প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
রাশিয়া-চীন-ইরান একসঙ্গে থাকলে
ভারতের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
সামনে কঠিন BRICS সম্মেলন
পরবর্তী BRICS সম্মেলন ভারতে হওয়ার কথা।
সেখানে অনেক দেশ চাইবে—
- ইরানের সমর্থনে যৌথ বিবৃতি
- ইসরায়েল-আমেরিকার সমালোচনা
এ অবস্থায় ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক চাপ তৈরি হবে।
গ্লোবাল সাউথের জন্য বড় প্রশ্ন
এই পুরো বিষয়টি শুধু ইরানের যুদ্ধ নয়,
বরং বড় প্রশ্ন তুলে:
👉 ভারত কি সত্যিই গ্লোবাল সাউথের নেতা?
👉 নাকি নিজের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?
আরও বড় প্রশ্ন:
👉 “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট” কি বাস্তব কৌশল,
নাকি শুধু কূটনৈতিক ভাষা?
বিশেষজ্ঞ জন মিয়ারশাইমারের মতে,
দেশগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থই আগে দেখে।
তাই BRICS-এর মতো জোটেও বিভাজন থাকবেই।
উপসংহার
ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে—
BRICS এখনো একটি দুর্বল ও বিভক্ত জোট।
ভারতের অবস্থান এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এবং ভবিষ্যতে এই জোট কতটা শক্তিশালী থাকবে,
তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Post a Comment