২০২৫ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত করেছে চীন, পশ্চিমাদের বাণিজ্য যুদ্ধকে অগ্রাহ্য করে
চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের ফলাফল এখন স্পষ্ট। যদিও এই শুল্কযুদ্ধকে ঘিরে তৈরি করা বর্ণনাটি পশ্চিমা জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্য সাজানো হয়েছিল, বাস্তবে এই যুদ্ধের ব্যর্থতা তাদের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
অর্থনৈতিক ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত
২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর আল জাজিরা জানায়, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে চীন ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। এই অঙ্কটি যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় ঋণের ওপর বছরে যে পরিমাণ সুদ পরিশোধ করে, তার সমান। অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটি প্রথম ঘটনা। বিশেষ করে বিস্ময়কর বিষয় হলো—১৯৭০-এর দশকে যেসব চীন ছিল দরিদ্র ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, সেই দেশই আজ এই সাফল্য অর্জন করেছে।
এই অর্জন পশ্চিমা প্রত্যাশাকে ভেঙে দিয়েছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনবিরোধী শুল্কযুদ্ধের কৌশলগত ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করেছে। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যম—যেমন The Economist—দাবি করে এসেছে যে চীনের অর্থনীতি শিগগিরই ধসে পড়বে এবং এটি তথাকথিত “ইনভলিউশন” (অভ্যন্তরীণ স্থবিরতা) চক্রে আটকে গেছে।
The Economist যুক্তি দিয়েছিল, চীন অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন করে, যা দেশের ভেতরে কম দামে বিক্রি হয়, আর লাভের একমাত্র উপায় পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি। তারা সৌর প্যানেল ও লিথিয়াম ব্যাটারির উদাহরণ দিয়ে বলেছিল—পশ্চিমা বাজারে এসব পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চীনের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।
এই ধারণাই ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের ভিত্তি ছিল। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করতেন, উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে চীন নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ চলাকালীনই চীনের এই ঐতিহাসিক উদ্বৃত্ত প্রমাণ করে যে চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক ছিল এবং পশ্চিমা বাধা সত্ত্বেও টিকে থাকতে পেরেছে।
বেসেন্টের “অসম ভারসাম্য”-এর গল্প
ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের নেপথ্যের মূল চিন্তাবিদ হিসেবে উঠে আসেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্টিভ বেসেন্ট। ২০২৫ সালের মে মাসে সুইজারল্যান্ডে চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি দাবি করেন—চীনের সমস্যা হলো “অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা”, আর যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা হলো অতিরিক্ত আর্থিক খাতনির্ভর অর্থনীতি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীন আর্থিক অভ্যাস—যেমন কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং, ঋণ নগদায়ন ও কৃত্রিম হিসাব—এসবকে কেবল “অসম ভারসাম্য” বলে আড়াল করার চেষ্টা করেন। তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করেছিল এবং অন্য পশ্চিমা দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটতে চাপ দিচ্ছিল।
বেসেন্ট মূলত চীনকে বলেছিলেন—যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ঋণ ও আর্থিক বিশৃঙ্খলার বোঝা চীনকে বহন করতে হবে, আর বদলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উৎপাদন সক্ষমতা গ্রহণ করবে; নইলে আরও শুল্ক আরোপ করা হবে। বাস্তবে এটি ছিল অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল।
শুল্কযুদ্ধের বাস্তব ফল
ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রায় ছয় মাস পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীনা শিল্পকারখানাগুলো ধসে পড়েনি; বরং তারা ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে চীন তথাকথিত “ইনভলিউশন”-এ আটকে নেই।
চীন অভ্যন্তরীণ দক্ষতা বাড়িয়েছে, রপ্তানি বাজার বহুমুখী করেছে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিকে থেকেছে। পশ্চিমারা যাকে “অতিরিক্ত উৎপাদন” বলেছিল, তা আসলে অ-পশ্চিমা বাজারে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
এই বাস্তবতা দেখায় যে পশ্চিমা গণমাধ্যম চীনের অর্থনীতি নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিসরলীকৃত ও বিভ্রান্তিকর বর্ণনা ছড়িয়েছে। তারা চীনের কম দাম ও উদ্বৃত্তকে সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে, অথচ পশ্চিমা বিশ্বের উচ্চ মূল্য ও ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে সাফল্য হিসেবে প্রচার করে।
এই বর্ণনাগুলোর লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা জনগণকে আশ্বস্ত করা এবং চীনকে বিভ্রান্ত করা—যাতে চীনও পশ্চিমা ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল অনুকরণ করে, যা মূলত কেবল অভিজাতদেরই উপকার করে।
গ্লোবাল সাউথের দৃষ্টিভঙ্গি
পশ্চিমা গণমাধ্যমের এসব বর্ণনা এখন ভেঙে পড়ছে। আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ক্রমশ বুঝতে পারছে যে পশ্চিমা অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনেক সময়ই কল্পনাপ্রসূত প্রচারণা।
চীনের সস্তা ও নির্ভরযোগ্য সৌর প্যানেল ও লিথিয়াম ব্যাটারি—যাকে পশ্চিমা দেশগুলো “অতিরিক্ত উৎপাদন” বলে সমালোচনা করে—আফ্রিকার মানুষের কাছে তা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ কারণে গ্লোবাল সাউথে পশ্চিমা সতর্কবার্তাগুলো ক্রমশ উপেক্ষিত হচ্ছে এবং এগুলোকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষাকারী প্রচারণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের তাৎপর্য
চীনের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের নীতিনির্ধারকরা চীনের উৎপাদন ক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতাকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন।
চীনা পণ্যের কম দাম, শক্তিশালী রপ্তানি অবকাঠামো ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে একীভূত হওয়া—যেগুলোকে পশ্চিমা দেশগুলো দুর্বলতা মনে করেছিল—বাস্তবে সেগুলোই চীনের শক্তির উৎস হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের পূর্বাভাস ভেঙে পড়ায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে অর্থনীতি বিচার করছে, আদর্শিক প্রচারণার ভিত্তিতে নয়।
---
সাইমন চেগে এনদিরিতু
আফ্রিকার একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও গবেষণা বিশ্লেষক

Post a Comment