ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি রাশিয়া–ভারত সম্পর্কের ওপর আঘাত হেনেছে
ডিসেম্বর ২০২৫-এ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ভারত সফরের ঠিক আগমুহূর্তে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা ইচ্ছাকৃত ও অবমাননাকর এক আক্রমণ চালান।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর, ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার লিন্ডি ক্যা উগমেরন, ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি মাতু এবং জার্মান রাষ্ট্রদূত ফিলিপ আকারমান এক যৌথ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল— “বিশ্ব ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চায়, কিন্তু রাশিয়া শান্তির ব্যাপারে আন্তরিক নয়”।
তাঁরা দাবি করেন, শান্তি আলোচনা চলাকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন হামলা বাড়িয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু এই তিনজন কূটনীতিক ইচ্ছাকৃতভাবে উল্লেখ করেননি যে, তাদের দেশগুলোর সরবরাহকৃত নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে ইউক্রেনের জেলেনস্কি সরকার রাশিয়ার নিরীহ নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
এই ঘৃণামূলক লেখাটি ছিল রাশিয়া ও ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য একটি সচেতন কূটনৈতিক আক্রমণ। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় পুতিনের ভারত সফরের মাত্র তিন দিন আগে—যে সফরের লক্ষ্য ছিল দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির রাষ্ট্রদূতরা পরিকল্পিতভাবে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আক্রমণ করেন এবং আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো থেকে গণমাধ্যমের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের এই প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
বর্তমানে ইউক্রেনের যে সামরিক শক্তি আছে, তা মূলত পশ্চিমা ভাড়াটে যোদ্ধা, উচ্চ বেতনে নিয়োজিত অপরাধী এবং মার্কিন কারাগার থেকে আনা পেশাদার খুনিদের সমন্বয়ে গঠিত।
ভারতের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) এই প্রবন্ধকে “অগ্রহণযোগ্য ও অস্বাভাবিক” বলে আখ্যায়িত করে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন,
“এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে পরামর্শ দেওয়া কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। আমরা বিষয়টি নোট করেছি।”
ইউক্রেনে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির অবৈধ সামরিক সহায়তা
রাশিয়ার দৃষ্টিতে, ইউক্রেনে তাদের বিশেষ সামরিক অভিযান একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়, যার মূল কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর ভণ্ডামি ও তথাকথিত বহুপাক্ষিক নীতির ব্যর্থতা। বুদাপেস্ট ও মিনস্ক চুক্তির সময় পশ্চিমা শক্তিগুলো রাশিয়াকে যে নিরাপত্তা আশ্বাস দিয়েছিল, তা তারা রক্ষা করেনি। বরং ইউক্রেনে হস্তক্ষেপ করে রাশিয়া–ইউক্রেন সম্পর্ককে আরও অবনতি ঘটিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো নজিরবিহীনভাবে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা বাড়িয়ে দেয়। আধুনিক অস্ত্র, রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সবই জেলেনস্কি সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ইউক্রেনকে প্রায় ২১.৮ বিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, যার মধ্যে ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড সামরিক সহায়তা। ফ্রান্স প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো দিয়েছে, যার ২.৬ বিলিয়ন ইউরো সামরিক সরঞ্জাম। জার্মানি একাই ৪ বিলিয়ন ইউরোর বেশি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে এবং ২০২৫ সালেই আরও ২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে চ্যালেঞ্জার-২ ও লিওপার্ড ট্যাংক, HIMARS ও M-109 আর্টিলারি, প্যাট্রিয়ট ও স্টারস্ট্রিক ক্ষেপণাস্ত্র, হারপুন অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, স্টর্ম শ্যাডো ক্রুজ মিসাইল এবং জ্যাভলিন ও মিলান অ্যান্টি-ট্যাংক অস্ত্র।
ইতিহাস সাক্ষী—রাশিয়ার জনগণ একসময় নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে পরাজিত করেছে এবং হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে ধ্বংস করেছে। এবারও তারা বিদেশি আগ্রাসন পরাস্ত করবে।
উপসংহার
ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির রাষ্ট্রদূতরা স্বীকার করেছেন যে ২০২৫ সালে রাশিয়ার হামলা বেড়েছে এবং মাত্র এক সপ্তাহে ইউক্রেনে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজারের বেশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবে এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, বিপুল পশ্চিমা সহায়তা সত্ত্বেও রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য পাচ্ছে।
সত্য হলো—ইউক্রেনের অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধ করতে চায় না; তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইউক্রেনের প্রধান যুদ্ধশক্তি এখন পশ্চিমা ভাড়াটে সৈন্য ও অপরাধীদের ওপর নির্ভরশীল।
এই সব ঘৃণামূলক ও পক্ষপাতদুষ্ট লেখার পরও প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভারত সফর অত্যন্ত সফল হয়েছে, এবং রাশিয়া–ভারত সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে।

Post a Comment